হৃদরোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর খাবার এবং করণীয়

বাংলাদেশে প্রতিবছর দুই লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যান, যার ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট। যেসব কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে তার মধ্যে ট্রান্সফ্যাট অন্যতম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ট্রান্সফ্যাটঘটিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।ওয়েবিনারে জানানো হয়, ট্রান্সফ্যাট একটি ক্ষতিকর খাদ্য উপাদান যা হৃদরোগ ও হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও) যা বাংলাদেশে ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত।তাই অবিলম্বে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ট্রান্সফাটঘটিত হৃদরোগ ঝুঁকি আশংকাজনক হারে বাড়তেই থাকবে।

হৃদরোগের ভয়াবহতার ব্যাপারে তেমন প্রচারণা নেই। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন জানিয়েছে, স্বাস্থ্যকর খাবার ও ধূমপানমুক্ত পরিবেশ ছাড়া কারও পক্ষে হৃদরোগের ব্যাপারে ঝুঁকিমুক্ত থাকা কঠিন।

হৃদরোগের কারণ –

১.উচ্চ কোলেস্টেরল।

২.উচ্চ রক্তচাপ।

৩.ডায়াবেটিস ।

৪.ধুমপান, তামাক সেবন বা মদ্যপান করা।

৫.অতিরিক্ত মানসিক চিন্তাযুক্ত জীবনযাপন।

স্বাস্থ্যকর খাবার তালিকায় কী কী জিনিস রাখতে হবে?

স্বাস্থ্যকর খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, বিভিন্ন প্রকারের শস্য দানা, শিম ও বিচি জাতীয় খাবার যেখানে প্রচুর প্রোটিন বা আমিষ থাকে, বাদাম, মাছ বিশেষত সামুদ্রিক তেলওয়ালা মাছ যাতে প্রচুর অসম্পৃক্ত চর্বি বা ওমেগা-৩ ফ্যটি এসিড থাকে যা রক্তে ভাল কোলেস্টেরল বা এইচ ডি এল এর মাত্রা বাড়ায়। রক্তের ভাল কোলেস্টেরল বা এইচ ডি এল হৃদযন্ত্রের করোনীর রক্তনালীতে ও অন্যান্য রক্তনালীতে ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। ফলে হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্ক স্ট্রোক ও হাত-পায়ের পচন বা গ্যাংগ্রিন হওয়ার ঝুঁকি কমায়। চামড়া ছাড়া মুরগি ও অন্যান্য পোল্ট্রি এবং উদ্ভিজ্জাত তেল ও উদ্ভিজ্জাত খাবার, কম চর্বি অথবা চর্বিমুক্ত ডেইরী খাবার এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বা রান্নার তেল যেমন সানফ্লাওয়ার ওয়েল, সয়াবিন তেল, ক্যানোলা ওয়েল, কর্ণ ওয়েল, ওলিভ ওয়েল, বাদামের ত্বল, স্যাফ্লাওয়ার তেল।

স্বাস্থ্যকর খাবারে কোন ধরনের জিনিস কম খেতে হবে?

কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার যেমন- ভাত, রুটি, আলু, চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয় কোক, ফান্টা, পেপসি, চিনি বা গুড়ের সরবত, মিশ্রি, মধু, কেক, রসালো ও বেশী মিষ্টি ফল কম খেতে হবে। কারণ কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারে ক্যালরি বেশী থাকে। তাই চর্বি জাতীয় খাবার কম খেতে হবে। যে সব পশুর মাংসে চর্বি বেশি থাকে তা কম খেতে হবে বা পরিহার করতে হবে। আবার পশুর মাংসের যে অংশে চর্বি বেশি থাকে তা বর্জন করতে হবে। পশুর মাংসে সাধারণত সম্পৃক্ত চর্বি বা ফ্যটি এসিড বেশী, যা রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল এর মাত্রা বাড়ায় ও বেশি ক্যালরি বহন করে তাই পশুর চর্বি বর্জনীয়। তবে চর্বি ছাড়া পশুর মাংস অর্থাৎ লীন কাট মীট খাওয়া যাএ যেখানে প্রোটিনের পরিমাণ বেশী থাকে এবং এই প্রোটিন অতি উচ্চ মাত্রার ও অতি উচ্চ গুণসম্পন্ন।

হৃদরোগ প্রতিরোধে করণীয়!

১. ধূমপান ও তামাক ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন-

সিগারেট এবং তামাক জাতীয় দ্রব্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান হৃদরোগ এবং ক্যানসারের কারণ হতে পারে। সময়ের সাথে সাথে সিগারেটের ধোঁয়া আপনার হৃদয় এবং রক্তনালীগুলোকে সংকীর্ণ করে এবং রক্তের পক্ষে আপনার অঙ্গে অক্সিজেন এবং পুষ্টি সরবরাহ করতে শক্ত করে তোলে। শুধু ধূমপান ছেড়ে দিয়ে আপনি পঞ্চাশ শতাংশ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারেন।

২. দৈনিক অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন-

প্রতিদিন নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করা আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। যখন আপনি শারীরিক ক্রিয়াকলাপকে যেমন স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার মতো অন্যান্য জীবনধারা ব্যবস্থার সাথে একত্র করেন, তখন সুফল আরও বেশি হয়। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ আপনাকে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আপনার হৃদয়কে উচ্চ চাপ দিতে পারে এমন উচ্চ অবস্থার যেমন উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ডায়াবেটিসের মতো পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা হ্রাস করতে সহায়তা করে।

৩. শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ফেলুন-

নিয়মিত কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমানো সম্ভব। এ ছাড়া খাদ্যাভাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যালোরি গ্রহণ কমিয়ে শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

৪. কোলেস্টেরল জাতীয় খাবার খাওয়া কমান-

কোলেস্টেরল সর্বদা আপনার রক্তনালীগুলোর ক্ষতি করার চেষ্টা করে। রক্তে খুব বেশি কোলেস্টেরল হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। কিছু কোলেস্টেরল খাবার থেকে আসে। ফ্যাট এবং কোলেস্টেরল কম খাবার খাওয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেহে খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ হ্রাস করতে পারি।

৫. আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান-

যেসব খাবারে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ আছে, সেসব খাবার খাবেন। আঁশযুক্ত খাদ্য রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। বেশি আঁশ আছে এ রকম সবজির মধ্যে রয়েছে শিম ও মটরশুঁটি জাতীয় সবজি, কলাই ও ডাল জাতীয় শস্য এবং ফলমূল। এছাড়া আলু এবং শেকড় জাতীয় সবজি খোসাসহ রান্না করলে সেগুলো থেকেও প্রচুর আঁশ পাওয়া যায়। পুষ্টি বিজ্ঞানীরা হোল গ্রেইন আটার রুটি এবং বাদামি চাল খাওয়ার পরামর্শ দেন।

৬. মানসিক চাপমুক্ত থাকুন-

মানসিকভাবে চাপমুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরী। এক্ষেত্রে দৈনিক পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। যেসব ব্যক্তি পর্যাপ্ত ঘুমায় না, তাদের স্থূলত্ব, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস এবং হতাশার ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়াও ধর্মোপাসনা, খেলাধুলা, ভ্রমণ ইত্যাদিও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।

৭. লবণকে বিদায় জানান-

লবণ বেশি খেলে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে বৃদ্ধি পায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও। খাওয়ার সময় পাতে অতিরিক্ত লবণ খাবেন না এবং খাবার টেবিলে লবণদানি রাখবেন না। লবণ কাঁচা হোক বা ভাজা হোক উভয়ই ক্ষতিকর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *