নরপিশাচ ড্রাকুলার পরিণতি – উসমানি খেলাফতের স্বর্ণকণিকা

নরপিশাচ ড্রাকুলার পরিণতি

‘ড্রাকুলা’ শব্দটি শুনতেই আমাদের সামনে এক রক্তখেকো ডাকু বা দস্যুর প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। আমরা অনেকেই মনে করি এটি রূপকথার কোনো নাম বা চরিত্র। আমাদের এ মানসিকতা তৈরি করেছে হলিউড-বলিউডের সব ড্রামা-সিনেমা। কিন্তু ড্রাকুলা একটি বাস্তবিক নাম। রোমান সম্রাট তৃতীয় ভ্লাদের উপাধি। যাকে অনেকেই রোমান বীর বলে গণ্য করে। তারা মনে করে যে, সে রোমান সাম্রাজ্যকে উসমানি সালতানাতের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই ড্রাকুলা ছিল এক রক্তখেকো পিশাচ শাসক। তার জুলুম-নির্যাতন, রক্তপাত ও পৈশাচিক পন্থায় হত্যার কালো অধ্যায় এখনো ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়নি।

উসমানি সুলতান প্রথম মুহাম্মাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর রোমানিয়া রাষ্ট্রকে নতজানু করতে সক্ষম হন। বার্ষিক কর দিতে তাদের বাধ্য করেন। রোমানিয়া নিজেদের পিঠ বাঁচাতে উসমানি খিলাফতের কর্তৃত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়। মূলত এরপর থেকেই রোমানিয়া উসমানি খিলাফতের একটি বন্ধুরাষ্ট্র বলে বিবেচিত হয়।

সুলতান প্রথম মুহাম্মাদের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর কালের পরিক্রমায় ড্রাকুলার পিতা দ্বিতীয় ভ্লাদ উসমানি খিলাফতের বিরুদ্ধে ইউরোপের ক্রুসেডারদের সঙ্গে আঁতাত করতে শুরু করে। উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ তার বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন। যুদ্ধে তাকে পরাজিত করে বার্ষিক কর দিতে চুক্তিবদ্ধ করেন। চুক্তির মধ্যে একটা শর্ত ছিল—‘সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ রোমানিয়ান সম্রাট দ্বিতীয় ভ্লাদের দুই সন্তান তৃতীয় ভ্লাদ (পরবর্তী সময়ে ড্রাকুলা নামে যে পরিচিতি লাভ করে) ও রাউলকে উসমানি সালতানাতের হেরেমে নিয়ে এসে লালনপালন করবেন।’

তৃতীয় ভ্লাদের (ড্রাকুলা) পিতা রোমানিয়ান সম্রাট দ্বিতীয় ভ্লাদ নিহত হওয়ার পর ১৪৪৭ খ্রিষ্টাব্দে উসমানিরা ড্রাকুলাকে ছেড়ে দেন। মুক্তি পাওয়ার পর সে পিতার ক্ষমতা উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকে। আর তার ভাই রাউল সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের অধীনে উসমানি সালতানাতের হেরেমে বড় হতে থাকে।

কয়েক বছর যেতে না যেতেই ড্রাকুলা ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দে উসমানিদের সহায়তায় রোমানিয়ার ক্ষমতা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ক্ষমতা পাওয়ার পরপরই সে বদলে যায়। উসমানি সালতানাতের অনুগ্রহ সম্পূর্ণ ভুলে বসে! তার ভেতরের সুপ্ত ক্রুসেডীয় জিঘাংসা জেগে ওঠে।

ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। উসমানি সালতানাত ও সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতা প্রদর্শন করে।

ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পরই শুরু করে তার পৈশাচিক শাসনের বীভৎস অধ্যায়। মুসলমানদের হত্যা করে টুকরো টুকরো করে নাক, কান আর হাত-পা কেটে নিত। কখনো কড়াইয়ে তেল গরম করে একেবারে ঝলসে দিত! কখনো কখনো মাথায় হাতুড়ি দিয়ে লোহার পেরেক বিদ্ধ করে মারত! আবার কখনো বন্দিদের কুঠুরিতে হিংস্র প্রাণী ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যা করাত!

ড্রাকুলাখ্যাত রাজা তৃতীয় ভ্লাদ নিজে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। সংগঠনের পরিচিতিমূলক নিদর্শন ছিল ‘তিন্নিন’ নামক একটি অদ্ভুত প্রাণী। তার মাথায় সবসময় রক্তের নেশা চেপে বসত। নিজের প্রাসাদে সে বিভিন্ন পশু-প্রাণীকে আটকে রেখে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করত। আর সবশেষে হত্যা করত। তার বসবাসের প্রাসাদটিই হয়ে গিয়েছিল সর্বসাধারণের মধ্যে ভীতিসঞ্চারক। ড্রাকুলাকে তার প্রজারা ‘মুখওয়াজ্জিক’ উপাধি দিয়েছিল। ‘খাজুক’-এর দিকে সম্বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এই উপাধি। খাজুক বলা হতো, ধারালো অগ্রভাগ আছে, এমন কাঠের টুকরোকে। বলা যায়, কিছুটা বর্শার মতো। খুবই পৈশাচিকভাবে সে খাজুক দিয়ে বন্দি ও বিরোধীদের হত্যা করত। খাজুকের মধ্যে গরম তেল মাখিয়ে বন্দিদের দেহের পশ্চাদভাগ দিয়ে ঢুকিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট দিয়ে তাদের হত্যা করত।

এমনকি সে ছোট্ট শিশুদের পর্যন্ত তাদের মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে খাজুক দিয়ে হত্যা করত!

একবার ড্রাকুলা এতই উন্মাদ হয়ে পড়ে যে, একটি মুসলিম শহরে হামলা করে ২৫ হাজার মুসলিমকে বন্দি করে নিয়ে খাজুক দিয়ে হত্যা করে! সংবাদটা এসে পৌঁছে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের কাছে।

এবার সুলতান রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন। নরপিশাচ ড্রাকুলাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার মনস্থ করেন। তারপর দেড়লাখ সৈন্যের বহর নিয়ে রোমানিয়া অভিমুখে যাত্রা করেন। সুলতান দ্রুতই পৌঁছে যান রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে। সেখানেই তাকে ড্রাকুলাবাহিনীর মুখোমুখী হতে হয়। উসমানিবাহিনীর হাতে নাকানিচুবানি খেয়ে একসময় ময়দান ছেড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় ড্রাকুলার বাহিনী। কিন্তু উসমানিরা ড্রাকুলাকে বন্দি করতে সক্ষম হয়নি। কারণ, সে পালিয়ে আশ্রয় নেয় হাঙ্গেরি সম্রাটের কাছে।

সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ বুখারেস্টের পথ ধরে আরও সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। চলার পথে বুখারেস্ট শহরের এখানে-ওখানে মুসলিম বন্দিদের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ড্রাকুলাখ্যাত নরপিশাচ ভ্লাদ এ সকল বন্দিদের বুলগেরিয়া থেকে বন্দি করে নিয়ে এসেছিল। তারপর এদেরও পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে লাশগুলো এভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রেখেছিল। এদের মধ্যে যেমন নারী-শিশু ছিল, তেমন ছিল বয়সের ভাবে ন্যুব্জ অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও! এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে সুলতান মর্মাহত হন, একেবারে ভেঙে পড়েন!

সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ বুখারেস্ট শহরে প্রবেশ করে শহরের গভর্নর নিযুক্ত করেন ড্রাকুলার সহোদর রাউলকে। ড্রাকুলার সঙ্গে এই রাউলই শিশুকাল থেকে উসমানি সালতানাতের অন্দরমহলে বেড়ে ওঠেন। সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ তাকে লালনপালন করেছেন। কাছে থেকে দেখেছেন। তার ওপর নির্ভর করতে পেরেছিলেন বলে আগেই তাকে ভিলেখের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন।

ড্রাকুলা কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না। সে শক্তি সঞ্চয় করে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে ১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে আবারও উসমানিদের মোকাবিলা করতে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু এবারও সেই একই অবস্থা। আগের মতোই তাকে পরাজিত হতে হয় উসমানিদের হাতে। উসমানি সেনাদের হাতেই তাকে প্রাণ হারাতে হয়। হত্যার ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে তার মাথাকে ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের দরবারে পাঠানো হয়।

সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ কর্তিত মস্তকের দিকে একনজর তাকানোর পর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। আশ্চর্যের বিষয় ছিল, কর্তিত মস্তকটি ছিল সেই মানুষের, যে কিনা একসময় উসমানি সালতানাতেরই হেরেমে লালিতপালিত হয়েছিল। কিন্তু মুসলিমবিদ্বেষ আর পৈশাচিকতাই তার এই পরিণতি ডেকে এনেছে।

এরপর সুলতান ফাতিহ ড্রাকুলার কর্তিত মস্তক দেশের শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে, অলিগলিতে প্রদক্ষিণ করার নির্দেশ দেন। সবশেষে তা ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে মানুষ ড্রাকুলার হত্যার ব্যাপারটি জানতে পেরে খুশি হয় এবং সারা জীবনের জন্য এ ঘটনা থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে।

উসমানি খেলাফতের স্বর্ণকণিকা

আইনুল হক কাসিমী

প্রকাশক : কালান্তর প্রকাশনী

পৃষ্ঠা : ৬৮-৭০

পোস্ট ক্রেডিট : কালান্তর প্রকাশনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *