তৈমুর লংয়ের কিছু কীর্তি

তৈমুর কি ইসলামি বিজেতা ছিলেন ?

তৈমুর একজন বিখ্যাত বিজেতা ছিলেন ঠিক কিন্তু ইসলামি বিজেতা হিসেবে তাঁর অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ তাকে ইসলামি বিজেতা হিসেবে স্বীকার করতে রাজি নন। কেননা, তার অভিযানের মধ্যে ইসলামি কোনো চিন্তাভাবনা বা সৎ উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি তার পূর্বপুরুষ চেঙ্গিস খানের মতো একের পর এক দেশ ও নগর বিজয়, সেখানকার অধিবাসীদের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অভিপ্রায়ে অভিযান পরিচালনা করতেন। তৈমুরের ব্যক্তিগত সকল ইতিবাচক গুণাবলির ওপর চেঙ্গিস খানের এই নেতিবাচক মনোভাব প্রভাব বিস্তার করেছিল। যদিও তিনি মুসলিম ঘরে জন্মেছিলেন; কিন্তু আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদার সঙ্গে তার খুব একটা সম্পর্ক ছিল না। প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি শিয়া মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।

আলিমদের সঙ্গে তৈমুরের আচরণ

তৈমুর লংয়ের কিছু কীর্তি: তৈমুরের রাজদরবারে সকল ঘরানা ও মতবাদের আলিমরা থাকতেন; কিন্তু তৈমুরের মেজাজ-মর্জির ওপর লক্ষ রেখে তাদের কথা বলতে হতো। তৈমুরের দরবারে সত্যকথা নির্ভীকভাবে উচ্চারণকারী আলিমদের কোনো স্থান ছিল না। তবে নীরবে-নিভৃতে শাস্ত্রীয় বিষয়ে পারদর্শিতা নিয়ে কাজ করে যাওয়া আলিমদের একটি জামাআত সবসময় তৈমুর নিজের কাছে রাখতেন। এভাবে মূলত তিনি নিজেকে জ্ঞানীদের একজন পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। মির সাইয়িদ শরিফ জুরজানি এবং আল্লামা সাআদুদ্দিন তাফতাজানি রাহ. এই শ্রেণির শাস্ত্রীয় আলিমদের দুটি উজ্জ্বল নাম। তাঁরা রাজদরবারে অবস্থান করতেন এবং তৈমুর তাঁদের খুব ভালোভাবে দেখভাল করতেন; কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, কখনো কখনো সামান্য ঘটনার জের ধরে তৈমুর আলিমদের ওপর তার প্রচণ্ড ক্ষোভ ও শাস্তি প্রদর্শন করত।একবার শাহজাদা মিরানশাহ ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছিল। হঠাৎ ঘোড়া থেকে পড়ে সামান্য আহত হয়। ঠিক সেখানেই মাওলানা মুহাম্মাদ কাখুকি নামাজ আদায় করছিলেন। উসতাজ কুতবুদ্দিন এবং হাবিব আউদিও সেখানে ছিলেন। এঁরা সবাই তৈমুরের রাজদরবারের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় আলিম ছিলেন এবং শাহজাদাদের তাঁরা শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করতেন। ঘটনা জানার পর তৈমুর তাঁদের সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়! দোষ শুধু এতটুকু ছিল যে, তাঁরা সেখানে উপস্থিত থাকা অবস্থায় কেন শাহজাদা ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। এ ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, কেমন ছিল তখনকার তৈমুরি বর্বরতা।

হেরাতবাসীর ওপর তৈমুর লংয়ের অমানবিক অত্যাচার

তৈমুরের দরবারে বহু আলিম ও ফকিহ ছিলেন। তৈমুর তাঁদের কথাবার্তা এবং উপদেশ মাঝেমধ্যে শোনতেন; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় তিনিই নিতেন। ব্যক্তিগতভাবে তৈমুর একজন স্বাধীনচেতা খামখেয়ালি মানুষ ছিলেন। তাঁর ধর্মীয় চিন্তাভাবনা শিয়া মতবাদের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ছিল। তবে তাঁর দরবারে শিয়া-সুন্নি উভয় শ্রেণির আলিম থাকতেন।শহর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে আলিমগণ অত্যন্ত ব্যথিত হন।

তাঁরা সবাই মিলে তৈমুরকে অনেক কষ্টে হেরাত নগরী ধ্বংসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত মুলতুবি করাতে সমর্থ হলেও তৈমুর শহরবাসীর ওপর এত অধিক পরিমাণে কর আরোপ করেন যে, তা আদায় করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।তৈমুরের সেনা-কর্মকর্তারা জনগণের কাছ থেকে কর আদায়ের সময় হাজার হাজার মানুষকে বন্দি করে তাদের ব্যক্তিগত মালামাল লুট করে নিত। গোপন করে রাখা মূল্যবান সম্পদগুলো কোথায় আছে, তা জানতে চেয়ে জনতার ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাত।

এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেকেই মৃত্যুবরণ করে। একজন ইতিহাসবিদের মতে, সে সময় হেরাত নগরীতে একটি দোকানও খোলা ছিল না। শহরের অলিগলি এবং বাজারে সর্বত্র লাশের স্তূপ পড়েছিল। শহরের নালাগুলোতে পানির পরিবর্তে দেখা যাচ্ছিল প্রবহমান রক্ত।

বিজয়ের স্মরণে রক্তের মিনার

তৈমুরের পরবর্তী হামলা ছিল ‘আসফজার’ দুর্গ। দাউদ নামে এখানকার একজন মুজাহিদ স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তৈমুরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তারা তৈমুরের আনুগত্য অস্বীকার করেন। তৈমুর এতে ক্ষুব্ধ হয়ে এমন হামলা করেন যে, খুব দ্রুত দুর্গের পতন হয়। এরপর তাদের প্রচণ্ড বর্বরতার শিকার হয় দুর্গের জনগণ।

হাজার হাজার মানুষকে তারা হত্যা করে। তৈমুর এই বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ এমন কিছু কাজ করেন, যা মানুষকে চেঙ্গিস খানের বর্বরতাও ভুলিয়ে দেয়। তিনি তাঁর বাহিনীকে আদেশ দেন, যেন একটি স্মৃতির মিনার তৈরি করা হয়, যেখানে স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হবে জীবিত মানুষের রক্তমাটি! তৈমুরের আদেশে সেনারা কয়েক হাজার মানুষকে বিরাট একটি গর্তে জীবন্ত মাটি চাপা দেয়। অত্যন্ত মর্মান্তিকভাবে কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। মাটিচাপার ফলে তাদের রক্ত, মাংস ও হাড্ডি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। জীবন্ত এসব মানুষের রক্তমাখা দুর্গন্ধময় এই মাটি দিয়েই তৈমুরের সেনারা বিজয়ের চিহ্নস্বরূপ স্মৃতির মিনার তৈরি করে। ইতিহাসের কলঙ্কময় অধ্যায় হিসেবে বহুদিন মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়েছিল এই মিনার। তৈমুরের বর্বরতা ও নৃশংসতার ঐতিহাসিক দলিল ছিল এটি।

তৈমুর লংয়ের জালালাবাদ আক্রমণ

হেরাতের জনগণের অবস্থা দেখে ফারাহ শহরের আমির মালিক জালালুদ্দিন তৈমুরের সামনে অস্ত্র জমা দিয়ে আনুগত্য স্বীকার করে নেন। ফারাহ নগরী দখলের পর তৈমুর জিরাহ অভিমুখে রওনা হন। কঠিন প্রতিরোধের পর এই শহরও তৈমুরের কবজায় চলে আসে। এখান থেকে তৈমুর জালালাবাদ শহরের দিকে এগোতে থাকেন।

এ শহরটি নওমুসলিম তাতার গভর্নরদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শহরের কাছাকাছি পৌঁছতেই তৈমুরের সামনে শহরের শাসকরা নিজেদের অস্ত্র ফেলে নতি স্বীকার করে; কিন্তু জনগণ তৈমুরের আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়।

সিস্তানের আমির কুতবুদ্দিন এই প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তিনি তৈমুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। ফলে কয়েকদিন পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতে থাকে। দুর্গের ভেতর থেকে জনগণ দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে যায়। একবার তৈমুরের সেনাদের ওপর আচমকা হামলা করে তাদের রসদ ও পশুপাল নিয়ে দুর্গে ফিরে আসে জালালাবাদি কিছু জানবাজ মুজাহিদ। এভাবে আরও কিছুদিন যুদ্ধ চলার পর তৈমুরি সেনারা পিছু না হটায় আমির কুতবুদ্দিন নিরাশ হয়ে পড়েন।

তিনি একদিন নীরবে নিজেকে তৈমুরের কাছে ধরা দিয়ে দেন। তবে জনগণ তখনো হাল ছাড়তে রাজি ছিল না।একদিন তৈমুর সেনাবাহিনীর সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে নগরপ্রাচীরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টির আড়াল গ্রহণ করে বেশ কিছু জানবাজ সেনা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে তৈমুরের ওপর হামলা করে বসে। তৈমুর আকস্মিক এই হামলায় গুরুতর আহত হন; কিন্তু টিকটিকির প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা তৈমুরি সেনারা এই হামলা প্রতিহত করে তাদের পিছু ধাওয়া করে। একপর্যায়ে তারা দুর্গের ভেতর প্রবেশ করে। এভাবে জালালাবাদ শহর তৈমুরের হাতে পতন হয়।

শহর পতনের পর তৈমুর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের আদেশ দেন। হাজার হাজার জনগণকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। শহরের প্রাচীর, বড় বড় দালান ও প্রাসাদ, মসজিদ-মিনার এবং খানকা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। মালিক কুতবুদ্দিনকে বন্দি করে সমরকন্দে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তৈমুর জালালাবাদে শাহে শাহান সিস্তানি নামের এক নেতাকে গভর্নর নিয়োগ করেন। এই ব্যক্তি আক্রমণের সময় নিজ গোত্র ও দলবলসহ তৈমুরের সামনে আত্মসমর্পণ করেছিল। যদিও সে একজন সরদার ছিল; কিন্তু প্রতিরোধ করার মতো সাহস ও মনোবল তার মধ্যে ছিল না।

দক্ষিণ-আফগানিস্তানের বিপর্যয়

৭৮৫ হিজরি—১৩৮৩ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ-আফগানিস্তানকে ধ্বংস করতে তৈমুর আরেকবার আফগানিস্তান আক্রমণ করেন। দক্ষিণ-আফগানিস্তান বহিঃশত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে ইতিহাস জুড়ে অত্যন্ত কঠিন প্রতিরোধ দেখিয়ে আসছিল। তৈমুরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দক্ষিণ-আফগানিস্তানে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয় তৈমুরকে।স্থানীয় যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোকে শায়েস্তা করতে তৈমুর একটি অভিনব ও নিষ্ঠুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

তিনি জারানজ অঞ্চলের ১৬ মাইল পূর্বে অবস্থিত একটি পানির বাঁধকে তার এই পরিকল্পনার অংশ বানান। এই বাঁধ থেকে জমানো পানির মাধ্যমে আশেপাশের অনেক শহর, গ্রাম এবং বসতির বাসিন্দারা সেচকাজ ও প্রয়োজনীয় পানি গ্রহণ করত। শত শত বছর ধরে এই বাঁধ তাদেরকে এই সেবা দিয়ে আসছিল। একে তারা ‘বান্দরুস্তম’ নামে ডাকত। দক্ষিণ-আফগানিস্তানের বিখ্যাত শহর হেলমান্দের পাহাড় থেকে বয়ে চলা হেলমান্দ নদীর ওপর এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। এই বাঁধ থেকে তৈরি করা খালগুলোর মাধ্যমে সুবিশাল খেতখামারসহ অন্য অঞ্চলগুলো মরুভূমির মধ্যেও সবুজের সমারোহে ভরে যেত।

অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দারা এই বাঁধের উপকারিতা ও উপযোগিতা দেখে অত্যন্ত অবাক হতো। এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের অন্য কোথাও থেকে শাকসবজি, চাল-ডাল বা এ ধরনের শস্য আমদানি করতে হতো না; কিন্তু তৈমুর লং জনগণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী এই বাঁধ ভেঙে দিতে বলেন। বাঁধ ভেঙে ফেলার কিছুদিনের মধ্যেই ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা পানিশূন্য হয়ে পড়ে।তৈমুর গ্রীষ্মকালে এই অভিযান চালিয়েছিলেন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে স্থানীয় জনগণকে অতিষ্ঠ করে ফেলে।

পানির জন্য হাহাকার করতে থাকে তারা। তৈমুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তো দূরের কথা, নিজেদের জীবন বাঁচাতে তারা পেরেশান হয়ে পড়ে। যাযাবর গোত্রগুলো ছাড়া অন্যান্য শহর ও গ্রামাঞ্চল—যেমন কান্দাহার, হেলমান্দ, বুস্ত শহরের বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে অন্য কোনো নিরাপদ অঞ্চলে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে করে জারানজ ও এর আশেপাশের এলাকাগুলো বেলুচিস্তান মরুভূমির মধ্যে হারিয়ে যায়। প্রায় ২০০ কিলোমিটার এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়। ফারাহ প্রদেশ একেবারে মরুময় হয়ে পড়ে। শত শত বাড়িঘর, দালানকোঠা এবং দুর্গের দেয়ালগুলো মরুভূমিতে হারিয়ে যেতে থাকে।

আজও দক্ষিণ-আফগানিস্তান ভ্রমণ করলে এ অঞ্চলে সে সময়ের সভ্যতা ও জনজীবনের সামান্য কিছু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।তৈমুর এটাই চাইতেন যে, তাকে বাধা দিতে আসা লোকগুলো যুদ্ধ করা ছাড়া নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যাক। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তৈমুর এটি বুঝতেই পারেননি যে, মানুষই হলো সমাজের প্রধান উপাদান। যদি মানুষকে তিনি জয় করতে না পারেন, তাহলে মরুভূমি বিজয় করে কী লাভ? যাইহোক, তৈমুর দক্ষিণ-আফগানিস্তান বিজয়ের পর বুস্ত (নিমরোজ প্রদেশের শহর), গারামসির, কান্দাহারসহ আশেপাশের সব অঞ্চল দখল করে নেন।

এরপর কান্দাহারের দায়িত্ব অনুগত আমির সাইফুদ্দিন বারলাসকে এবং কুন্দুজের দায়িত্ব আমির জাহানদারশাহের হাতে তুলে দেন। এ সময়ে কাবুলের শাসনকর্তা তৈমুরের কাছে অস্ত্র জমা দেয়। সম্পূর্ণ আফগানিস্তান বিজয়ের পর খুব দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে যান তৈমুর। কেননা, বেশি দিন এখানে অবস্থান করা তার কাছে বিপজ্জনক মনে হচ্ছিল। ফলে মাত্র ১৪ দিনের মাথায় দক্ষিণ-আফগানিস্তান থেকে তার রাজধানী সমরকন্দে ফিরে আসেন।

গোত্রীয় যুদ্ধবাজদের প্রতিরোধ

৭৯৬ হিজরি—১৩৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তৈমুর তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সুযোগ্য পুত্র শাহরুখ মির্জাকে আফগানের শাসনভার অর্পণ করেন। এ সময় তিনি নিজে হিন্দুস্থান বিজয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন।পরের বছরই তৈমুর হিন্দুস্থান অভিযানে বের হন। হিন্দুকুশ পর্বতমালা অতিক্রমের সময় তাকে জানানো হয়, এই পর্বতমালা এবং তার আশেপাশের গিরিপথ ও উপত্যকায় পাহাড়ি যুদ্ধবাজ গোত্রগুলো বাস করে। তারা কোনো বহিরাগতের অধীনতা স্বীকার করে না।

জীবন দিয়ে হলেও তারা এই এলাকাগুলো স্বাধীন রাখতে চায়।এ বিষয়টি তৈমুরের কানে আসা মাত্রই তিনি সেনাবাহিনীর অভিযান থামিয়ে দেন। এরপর ১০ হাজার সেনার একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে উত্তর দিকের পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে যান। তৈমুরের পরিকল্পনা ছিল, আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে গোত্রগুলোকে তিনি শায়েস্তা করবেন।

উপত্যকায় পৌঁছে যুদ্ধবাজ গোত্রগুলোর সঙ্গে তাদের মোকাবিলা হয়; কিন্তু শীতকাল থাকায় তখন প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছিল। কোনো পক্ষই যুদ্ধে নিজেদের এগিয়ে রাখতে পারছিল না। ফলে বাধ্য হয়ে তৈমুর ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু ইতিমধ্যেই প্রচণ্ড প্রতিকূল আবহাওয়া ও তুষারপাতের ফলে ১০ হাজার সেনার অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। তৈমুর কোনোরকমে বাকি সেনাদের বাঁচিয়ে খুব দ্রুত কাবুল ফিরে আসেন এবং স্থানীয় জনগণকে মিথ্যা বিজয়ের গল্প শোনান। তৈমুরের তখন ধারণা হয়ে যায়, হিন্দুকুশ পর্বতমালার এই অংশ দিয়ে হিন্দুস্থানে প্রবেশ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ভিন্ন পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন তৈমুর।

তিরন্দাজ পাঠানদের হামলা

কাবুল থেকে সরাসরি পূর্ব দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে আইজিআব নামে একটি দুর্গ অতিক্রম করতে হতো। এখানে পাঠান সম্প্রদায়ের লোকেরা বাস করে। তৈমুর তার বাহিনী নিয়ে এই দুর্গে অবস্থান নেন এবং তার জন্য একটি আলাদা বাসস্থান নির্মাণের নির্দেশ দেন। ১৪ দিনের মধ্যে তৈমুরের জন্য একটি মহল তৈরি হয়ে যায়। একদিন তৈমুর ঘোড়ায় চেপে দুর্গ থেকে বেরিয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন।

হঠাৎ শাঁ শাঁ করে বাতাসের আওয়াজ কেটে কিছু একটা চারপাশের নীরবতায় বিঘ্ন ঘটায়। তৈমুরের প্রশিক্ষিত ঘোড়াটি পরিচিত শব্দ শুনতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ওঠে এবং ঠিক তখনই একটি তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তৈমুরের সামনে মাটিতে আছড়ে পড়ে। তৈমুর তড়িঘড়ি তাকিয়ে দেখেন, দুর্গের দেয়াল থেকে একজন পাঠান তাকে লক্ষ্য করে তির নিক্ষেপ করেছে। তৈমুর ক্রোধে পাগল হয়ে সঙ্গে সঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করেন এবং দুর্গের শাসনকর্তা ও মন্ত্রীদের বন্দি করে নিয়ে আসতে নির্দেশ দেন।

তৈমুরকে তির নিক্ষেপকারী পাঠান ও তার সাথিরা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বীরের মতো লড়াই শুরু করে। বেশ কিছু সেনাকে ঘায়েল করার পর তারা শহিদ হয়ে যায়। তৈমুর এতই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন যে, কোনো অজুহাত শোনা ছাড়া শাসনকর্তা, মন্ত্রিপরিষদসহ দুর্গের সবাইকে হত্যার আদেশ দেন। এরপর তৈমুরের রীতি অনুযায়ী দুর্গটি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়। এই দুর্গে বসবাসকারী সবাই পশতুন গোত্রের সদস্য ছিলেন।

তৈমুর লংয়ের দিল্লির ওপর হামলা

তৈমুর মধ্য-এশিয়া এবং হিন্দুস্থানের সঙ্গমস্থল আফগানিস্তান বিজয়ের পর অহংকার ও আত্মম্ভরিতার সঙ্গে এক বিশাল বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্থান অভিমুখে রওনা হন। সিন্ধু নদের পশ্চিম পাশে অগণিত শহর তৈমুরি বাহিনীর হাতে সমকাল থেকে হারিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে পড়ে। যারা আনুগত্য স্বীকার করেছিল, তারাও বাদশাহ থেকে গোলামে পরিণত হয়। ৮০১ হিজরি—১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈমুর দিল্লিতে প্রবেশ করেন।

এ সময় দিল্লি শহরে প্রবেশ না করে দিল্লি গেটের বাইরে তৈমুর তার তাঁবু স্থাপন করেন। সেখানে ৩ দিন পর্যন্ত শরাব এবং কাবাবে হিন্দুস্থান বিজয়ের উৎসব পালন করতে থাকে তৈমুরের বর্বর বাহিনী। ওদিকে তৈমুরি সেনাবাহিনীর বড় অংশ দিল্লি শহরে চালাচ্ছিল ইতিহাসের ঘৃণ্যতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। পুরো দিল্লি শহরে চলছিল লুটের মহোৎসব। তিন মাস হিন্দুস্থানে অবস্থান করে প্রচুর ধনসম্পদ সঙ্গে নিয়ে আরেক চেঙ্গিস খান নাম ধারণ করে সমরকন্দ ফিরে যান তৈমুর লং। পেছনে রেখে যান ইতিহাসের বর্বরতম নিষ্ঠুর কালো অধ্যায়।

ইরাক ও সিরিয়া আক্রমণ

দুই বছর পর তৈমুর এবার পশ্চিমের পথ ধরেন। ইরান আগে থেকেই তৈমুরের শাসনাধীন ছিল। এবার তিনি ইরাক ও সিরিয়া দখলের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সিরিয়ায় প্রবেশ করে তৈমুরের সেনাবাহিনী দামেশক শহরকে লন্ডভন্ড করে দেয়। সময়ের সেরা নগরী কিছুদিনের মধ্যেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। বাগদাদ পৌঁছে তৈমুর লং চেঙ্গিস খানকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেন।

মাত্র দুই সপ্তাহে বাগদাদ শহরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে ৯০ হাজার মুসলমানকে জবাই করে হত্যা করে তৈমুরের নিষ্ঠুর সেনারা। মসজিদ, মাদরাসা, খানকাসহ পুরো বাগদাদ শহরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে তারা। এরপর তৈমুর শক্তিশালী উসমানি খিলাফতের দিকে হিংসার লোলুপ দৃষ্টি ফেলেন এবং বায়েজিদের ভূমিতে আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সে সময় বায়েজিদ ইয়ালদারাম ইউরোপের পূর্বাঞ্চল দখল করে মধ্য-ইউরোপে প্রবেশের জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন।

বায়েজিদের কোমরে তৈমুরি খঞ্জর

বায়েজিদের একের পর এক সফল বিজয়াভিযান ও নিয়মিত ইউরোপীয়দের নাকাল করার সাহসী গল্পগুলো কেন যেন তৈমুরের সহ্য হতো না। তিনি চাইতেন, পৃথিবী যেন বায়েজিদের আলোচনা না করে বরং সবসময় তৈমুরের প্রশংসা আর গুনকীর্তন করে। এ জন্য তিনি বায়েজিদকে রুখে দিতে তাঁকে আনাতোলিয়ায় পেছন থেকে আঘাতের পরিকল্পনা করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তৈমুরি বাহিনী আনাতোলিয়া বিখ্যাত শহর সাইরাসে হামলা করে। ৪ হাজার আর্মেনীয় যুদ্ধবন্দি তাদের হাতে আসে, যারা ছিল ধার্মিক মুসলিম এবং তুর্কি সাম্রাজ্যের সীমান্তপ্রহরী। তৈমুরের আদেশে এই বন্দিদের জীবিত পুড়িয়ে মারা হয় এবং ১ হাজার বন্দিকে জীবন্ত দাফন করে তাঁর সেনারা।

উসমানি খলিফা এ সময় ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সম্মিলিত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপের গভীরে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর কাছে যখন সংবাদ পৌঁছে, আনাতোলিয়ায় তৈমুর হামলা করেছেন, তখন বাধ্য হয়ে তাঁকে উসমানি খিলাফতের এশীয় অংশকে ধরে রাখতে অভিযান থামিয়ে ফিরে আসতে হয়।এরপর তৈমুরের সঙ্গে সুলতান বায়েজিদের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই ধারাবাহিকতায় ৮০৫ হিজরি—১৪০২ খ্রিষ্টাব্দে আঙ্কারার ময়দানে মোঙ্গল এবং উসমানি অর্থাৎ, সময়ের সেরা দুই পরাশক্তির মধ্যে শক্তিপরীক্ষার সময় এসে পড়ে।

সেনাসংখ্যার আধিক্যের ফলে তৈমুর বায়েজিদের সেনাবাহিনীকে দ্রুত ঘায়েল করে ফেলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের পাশাপাশি বায়েজিদ নিজেও গ্রেপ্তার হন। পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে বন্দি অবস্থায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান বায়েজিদ। অস্তমিত হয় ইসলামি ইতিহাসের মহান একজন সুলতানের। ইতিহাস বলে, তৈমুর যদি পেছন থেকে এসে উসমানিদের ওপর হামলা না করতেন, তাহলে ইউরোপ আজ পুরোটাই ইসলামের ছায়াতলে থাকত। এসবের জন্য সম্পূর্ণরূপে তৈমুরই দায়ী।

সবশেষে শাবান ৮০৭ হিজরি—১৪০৪ খ্রিষ্টাব্দে তৈমুরের মৃত্যুর সময় চলে আসে। সুবিশাল সাম্রাজ্য জুলুম-বর্বরতার মাধ্যমে অর্জন করে তিনি পরকালের পথে যাত্রা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *