আরব বিদ্রোহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অধঃপতনের ইতিহাস

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আরব রাজপরিবার শাসিত সরকারগুলু একে একে সবাই ইসরাইলের সাথে বাণিজ্যিক আর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করছে, যা প্যালেস্টাইনের মুসলিমদের সাথে সরাসরি বেইমানি। বেপারটা দুঃখজনক, কিন্তু আশ্চর্য না মোটেও, কারণ ক্ষমতাসীন সব রাজ পরিবারের জন্মই মুসলিম উম্মাহর সাথে বেইমানি করে।

দুঃখজনকভাবে বর্তমানে আমরা প্রায় সব মুসলিমরাই নিজেদের ইতিহাস ভুলে গেছি , ইসলামের ইতিহাসও ভুলে গেছি, ধর্মের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা উদাসীন। আমরা নিজেদের জাতি গোত্রের অতিসম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাই বেশি।

অটোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র

বস্তুতপক্ষে মুসলমানদের ইচ্ছাপ্রণোদিত ভাবে নিজেদের ইসলামিক ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। ইতিহাসের পাতা এখন বিশ্বাসঘাতক আর অত্যাচারকারীর কাহিনীতে ভরা , যারা এখন এইসব ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চায়।

আমরা মুসলমানরা যদি আবারও সামনে এগিয়ে যেতে চাই , আমাদের আগে অবশ্যই জানতে হবে আমরা কিভাবে পিছিয়ে পড়লাম।

তথ্যসূত্র: আরব বিদ্রোহ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অধঃপতনের ইতিহাস নিয়ে বাংলা ডকুমেন্টারী https://youtu.be/SSd2eud8nD4

আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়েছে এবং আরবরাই প্রথম ইসলামকে পৃথিবীর বিভিন্ন সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছে। পরবর্তীতে অন্নান্য জাতি গোষ্ঠীও ইসলাম গ্রহণ করে। পার্সিয়ান, তুর্কি, আফ্রিকান বারবার , মঙ্গোল খানেতের শাসকেরা সবাই ইসলামকে আরো দূরদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং অনেকবার মুসলিম উম্মার প্রয়োজনে জীবন দিয়ে ইউরোপীয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

দীর্ঘদিন তুর্কিরা মুসলিম উম্মার জন্য লড়েছে এবং খেলাফতের দায়িত্বেও থেকে পুরো উম্মার জন্য জন্য কাজ করেছে।

সেলজুকরা একসময় এসেছিলো এবং রক্তপিপাসু ইউরোপিয়ান ত্রুসেডারদের ধুলার সাথে মিশিয়ে ফেলেছিলো। যখন ৫0,000 ত্রুসেডার যুদ্ধ করতে এসেছিলো , বীর সিংহ নামে পরিচিত , সুলতান আল্প আর্সলান প্রতিরোধ করতে মাত্র ১৫ হাজার সৈন্য নিয়ে এগিয়ে আসলেন।

তিনি সব সৈন্যকে সাদা পোশাকে পড়তে বললেন , তিনি বলেছিলেন,

আজ হলো আমাদের বিবাহ দিবস , এজন্যই আমরা সাদা পোশাক পড়েছি , আমাদের জীবন দিয়ে হলেও এই ত্রুসেডারদের আজ আমরা থামাবোই। আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন চ্যাপ্টার লিখতে যাচ্ছি।”

সেই সেলজুক বাহিনী ঐদিন ইসলামকে রক্ষা করতে জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল।

তারপর ওসমান গাজীর বংশধরেরা ক্ষমতায় আসে এবং ৮০০ বছর ইসলামকে সুউচ্চ অবস্থানে রেখেছিলো। তারা ইসলামের পবিত্র স্থানকে হেফাজতের জন্য আমরণ চেষ্টা করে গেছে। তারা মুসলমানদের অধিকার সমুন্নত রেখেছিলো। এমনকি অমুসলিম প্রজাদের সম্রাজ্যের ভিতরে যথাযথ অধিকার দিয়েছিলো।

অটোম্যানরা আমাদের নবী রাসুল্লাহ (সাঃ ) এর হাদীসকে সর্বোচ সম্মান দিয়ে চলতো , আমাদের নবী (সাঃ ) একবার বলেছিলেন,

“মানবজাতির মধ্যে মুসলিম উম্মা হলো একটু সম্পূর্ণ ভিন্ন আর বিশেষ একটি জাতি। তাদের সবার সীমানা হলো এক সীমানা , তাদের যুদ্ধ হলো এক যুদ্ধ , তাদের শান্তিও এক , তাদের সম্মান ও এক এবং তাদের বিশ্বাস ও এক। “

অটোমানরা তাদের উম্মার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সকল জাতি গোত্রকেই সম্মান করে সমানভাবে। অটোমেনরা বিশেষভাবে আরবদের সম্মান ও ভক্তি করতো এবং আরবদের ” সম্মানী মানুষ” বলে সম্ভোধন করে ডাকতো।

কিন্তু পরবর্তীতে ইতিহাসে কি হলো?

অটোম্যান সুলতানের সবচেয়ে খারাপ আর দুর্বল সময়ে , মুসলিম উম্মা আর খেলাফতকে রক্ষা করতে অটোম্যান সৈন্যরা একসাথে ২০টির বেশি সীমান্তে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো। আরবরা এরকম দুঃসময়ে খলিফার সাথে বিশ্বাস ঘাতগতা করে।

অর্থ আর ক্ষমতার লোভে মক্কার শরীফ হোসাইন , ইজিপ্টে ব্রিটিশ হাই কমিশনার হেনরি ম্যাকমোহনের সাথে ১৯১৫ সাল থেকে পত্র মারফত গোপন চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল। ব্রিটিশরা সমগ্র আরবের ক্ষমতা হোসাইনের হাতে দেয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো।

বিনিময়ে হোসাইন , অটোমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ব্রিটিশদের সাহায্য প্রার্থী হয়েছিল। ব্রিটিশরা ক্ষমতা আর টাকার লোভ দেখিয়ে মুসলমানদের , মুসলমানদের উপর যুদ্ধ চালাতে প্ররোচনা দিয়েছে।

শরীফ হোসাইন আমাদের মহানবী (সা:) র বংশধর হওয়ায় , আরব তথা মুসলিম বিশ্বে যে তাদের কদর আর সম্মান ছিল , সেটা কাজে লাগিয়ে , ব্রিটিশরা পরিকল্পনা করে অটোমান মুসলমান সৈন্যদের উপর লেলিয়ে দিয়েছিলো।

যেখানে অটোমান সৈন্যরা প্রানপন দিয়ে আরব ভূমি তথা প্যালেস্টাইন কে খ্রিষ্টানদের থেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করছিলো। ব্রিটিশরা ক্রিস্টমাসের আগেই পবিত্র ভূমি প্যালেস্টাইনকে দখল করে , তাদের হাজার বছরের ত্রুসেডের ব্যর্থতার প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল।

ব্রিটিশরা আমাদের মহানবীর বংশধর , মক্কার শরীফ হোসাইন , যেকিনা মক্কা মদিনার অটোমানদের নিযুক্ত গভর্নর ও ছিল, তাকে বলেছিলো,

”তোমরা কেন এই তুর্কিদের অধীনে থাকবে, তোমরা কেন তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছনা ? তোমাকে আমরা নতুন খলিফা বানাবো। এই অটোমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করো। “

কিছু আরব বীর অটোমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উম্মা আর খেলাফতের সাথে বেইমানি করেনি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অধিকাংশ আরবরাই তখন অটোমান খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।

ব্রিটিশদের কখনোই আরবদের সাহায্য করার কোনোরকম পরিকল্পনা ছিলোনা। বোকা , ক্ষমতালোভী শরীফ হোসাইন ব্রিটিশদের ভয়ংকর ফাঁদে পা দেয়।

ব্রিটিশদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মুসলিম উম্মাকে ভাগ করে , অটোমান সুলতানকে দুর্বল করা। খেলাফতকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে ত্রুসেড চালিয়ে যাওয়া।

থিওডর হেরজেল , জিওনিস্ট মুভমেন্টএর জনক এবং হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট থেকে আসা এক সাংবাদিক অটোমান সুলতান আব্দুল হামিদদের সাথে একবার সাক্ষাতের সুযোগ পায়, এমনকি এই সাক্ষাতের ১২০ বছর পুরোনো ভিডিও ফুটেজ এখনো পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায় থিওডোর হেরজাল সুলতানের সন্মমুক্ষে মাথা নুইয়ে সম্মান করছে।

১৯০০ সালে, সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ , বহিরাগত ইহুদিদের প্যালেস্টিনিয়ান এলাকায় অবস্থানের উপর সময় বেঁধে দেন যে, ৩০ দিনের বেশি সেখানে অবস্থান করতে পারবে না। তিনি আরো আইন করেন যে, বহিরাগত ইহুদিরা অটোমান সম্রাজ্যের কোনো জমি অধিগ্রহণ করতে পড়তে পারবে না, বিশেষকরে প্যালেস্টাইন এলাকায়।

থিওডর হেরজেল , অটোমান সম্রাজ্যে ঘুরে ঘুরে বহুবার সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা চালাতে থাকেন। যাইহোক ১৯০১ সালের মে মাসে , সুলতানের পোল্যান্ড অবস্থানরত পরামর্শদাতাকে অনেকবার ধর্ণা দিয়ে অবশেষে সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদের সাথে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের সুযোগ পায়। এই সাক্ষাতের সময় , থিওডর হেরজেল বিশ্ববেপী জিওনিস্ট নেতাদের পক্ষে সুলতানের কাছে , প্যালেস্টাইন এর জমি তাদের কাছে বিক্রি করার প্রস্তাব দেয় এবং জিওনিস্টদের হাতে প্যালেস্টাইন কে শাসন করার পূর্ণ ক্ষমতা দিতে অনুরোধ জানান, বিনিময়ে অটোমান সম্রাজ্যের সমস্ত অর্থনৈতিক ঋণ শোধ করে দেয়ার এবং সুলতানের পক্ষে জিওনিস্ট নিউস পেপার গুলাতে প্রোপাগান্ডা সংবাদ প্রকাশের সুবিধা দিতে চান।

সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ এই অফার পেয়ে এই উত্তর দিয়েছিলেন,

“আমি বিক্রি করবোনা , এমনকি এক ইঞ্চি জায়গায় বিক্রি করবোনা , কারণ এই জায়গার মালিক আমি না , অটোমানরা এই পবিত্রভূমিকে নিজেদের রক্ত দিয়ে রক্ষা করে আসতেছে ৪০০ বছর ধরে। “

একবছর পর থিওডর হেরজেল আবারও একই প্রস্তাব নিয়ে সুলতান আব্দুল হামিদের কাছে আসেন। সুলতান বরাবরের মতোই কঠোরভাষায এরকম প্রস্তাব নাকোচ করে দেন।

কিন্তু আরব গোত্রের নেতারা বিদেশী ঔপনবেশিক বেনিয়াদের দাবার গুটিতে পরিণত হয়। ব্রিটিশদের গোলাম হয়ে অটোমানদের সাথে প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত হয়, টাকা আর ক্ষমতার লোভে।

যখন আরবরা অটোমান খেলাফতের সাথে বেইমানি আর সংঘষে জড়িত ছিল, ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান, ইতালিয়ানরা গোপনে মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করার পরিকল্পনা করছিলো, এক হাজার বছর আগে ত্রুসেডে হেরে যাওয়ার প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করছিলো।

আরব বিদ্রোহের মাধ্যমে আমাদের মহানবী (সাঃ ) এর বিখ্যাত হাদিস সত্যে পরিণত হলো,

একটা সময় আসবে , বিভিন্ন জাতি তোমাদের বিরুদ্ধে একত্র হবে, যেমনটা মানুষজন দাওয়াতের খাওয়াদাওয়ার জন্য একত্র হয়, একজন আরেকজনকে খাবার ভাগ করার জন্য ডাকবে।

জনৈক ব্যাক্তি বলেছিলেন,

” ইয়া রাসূলুল্লাহ , আমরা কি সংখ্যায় কম হবো , এই কারণে আমাদের এই অবস্থা হবে?”

প্রতিউত্তরে মহানবী (সাঃ) বলেছিলেন ,

“না, ঐসময়ে তোমরা সংখ্যায় অনেক বেশি থাকবে , কিন্তু তোমরা সাগরের ময়লা কীটের মতো , স্রোতের সাথে ভেসে যাবে এবং আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে শত্রুদের বুকে যে ভয় কাজ করতো সেটা তুলে নিবেন, এবং তোমাদের মনে ‘আল ওয়াহা’ন’ দিয়ে দিবেন। “

জনৈক ব্যাক্তি জিজ্ঞাসা করেছিলেন,

“‘আল ওয়াহা’ন’ কি ?”

প্রতিউত্তরে মহানবী (সাঃ) বলেছিলেন ,

“দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা আর মৃত্যুর প্রতি অপছন্দ “

সুনান আবু দাউদ , ৪২৯৭ , চ্যাপ্টার ৩৯, হাদিস ৭

থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স (১৮৮৮-১৯৩৫) , ব্রিটিশ প্রোপাগান্ডা ফিল্ম লরেন্স অফ এরাবিয়ার মাধ্যমে বর্তমানে জনপ্রীয় টি ই লরেন্স, যিনি ১৯০৭ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ডের Jesus কলেজে ইতিহাস অধ্যয়ণরত অবস্থায় , এক বছরের জন্য প্যালেস্টাইন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত ত্রুসেডারদের হারিয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদের উপর প্রত্নতাত্বিক গবেষণার জন্য এসেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়াম এর অর্থায়নে প্রত্নতাত্বিক গবেষণা চালিয়ে যান, এবং আরবদের ভাষা আর প্রথা , চিন্তা ভাবনার ধরণ তিনি খুব ভালোভাবে বুঝে উঠেন এই সময়ে।

১৯১৪ সালে ব্রিটিশ মিলিটারি, টি ই লরেন্সকে গোপনে সিনাই উপতক্যা , নেজেব মরুভুমিতে মিলিটারি সার্ভে করতে পাঠায় , যে অঞ্চলটা অটোমান সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। টি ই লরেন্স প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করার ভান ধরে, এভাবেই ব্রিটিশ মিলিটারির স্পাই হিসেবে কাজ শুরু করে। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শুরুতে টি ই লরেন্স কায়রোতে ব্রিটিশ ইন্টিলিজেন্স অফিসার হন। ১৯১৬ সালে তাকে হিজাজে অর্থাৎ সৌদি এরাবিয়ায় বদলি করা হয়, সেখানে হাসেমাইট বাহিনীর সাথে মিলে, অটোমানদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য।

প্রকৃতপক্ষে এই সময় তার প্রধান কাজ ছিল হিজাজের মধ্যে অর্থলোভী , ক্ষমতালোভী গোত্র নেতাদের প্রতি মাসে স্বর্ণমুদ্রা ঘুষ দেয়া। ব্রিটিশরা অটোমান খেলাফতের সাথে যুদ্ধে না জড়িয়ে, আরবদের চিরতরে অটোমান তুর্কীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ঠেলে দিয়েছিলো।

ব্রিটিশরা আরবদের বলতো,

“তোমরা কিভাবে এমন এক সুলতানের অধীনে , যে আরব না। “

আরবরা এইসব শুনে , অটোমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো।

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় , অটোমান তুর্কিরা সব সময়ই আরবদের অন্যরকম সম্মানের চোখে দেখতো , কারণ রাসূলুল্লাহ (সা:) আরব ছিলেন। অটোমান তুর্কিদের মধ্যে প্রথা ছিল যে আরবদের দেখলেই হাতে চুমো খেত , কারণ আরবরা রাসুল্লাহ (সাঃ) বংশধর এই সম্মানে। এমনকি এখনো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে তুর্কি নাগরিকের সামনে রাসুল্লাহ (সাঃ ) এর নাম উঠলেই দাঁড়িয়ে তারা বুকে হাত রেখে সাল্লেল্লাহু আলাইহিসসালাম পাঠ করার প্রথা চালু রেখেছে।

কিন্তু আরবরা অটোমান খলিফার চরম মুহূর্তে বিশ্বাস ঘাতগতা করেছে এবং ব্রিটিশদের সাথে যোগ দিয়ে। আরবদের এই বেইমানির কারণে , ব্রিটিশ এবং ফ্রেঞ্চরা পবিত্রভূমি দখল করতে সক্ষম হয়েছিল।

এটা উর্ল্লেখ করা জরুরি যে , অল্প সংখক আরব ছিল যারা পুরু সময় খলিফার অনুগত্য ছিল এবং অটোমান তুর্কিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।

সুলতানের আর্মি সিরিয়ার দামেস্ক থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় , আরবদের এই বেইমানির কারণে। আল কুদস অর্থাৎ জেরুসালেমে আরবরা, ত্রুসেডার ইউরোপিয়ানদের দখল করার সব সুযোগ করে দিয়েছে।

একের পর এক আরব শহর ব্রিটিশদের কাছে হাতে পতন হতে থাকে , কিন্তু একটা শহর ব্রিটিশদের হাতে পড়তে দেয়নি অটোমান সৈন্যরা। অটোমান সৈন্যরা তাদের শেষ রক্ত দিয়েও একটা শহর রক্ষা করেছিল,এই শহরটি হলো আমাদের নবী (সাঃ ) এর শহর মদিনা।

ওমর ফকরুদ্দিন পাশা (১৮৬৮-১৯৪৮ ) অনেকগুলো যুদ্ধে লড়ে , ব্রিটিশদের দ্বারা চক্রান্ত করা আরব বিদ্রোহ শুরু হলে, ১৯১৬ সালে মদিনায় আসেন। ফখরুদ্দিন পাশা আর তার অটোমান সৈন্যরা মহানবী (সাঃ) এর মদিনা শহরকে সারেন্ডার করেনি কখনো এবং ১৯১৬ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত জীবনদিয়ে রক্ষা করেছে।

ওমর ফকরুদ্দিন পাশা, অটোমান জেনারেল আর বীর সৈনিক , যার সম্পর্কে শত্রু টি ই লরেন্স লিখেছেন , মরুভূমির বাঘ বলে সম্ভোদন করে। ওমর ফকরুদ্দিন পাশা নানা বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়ে মদিনাকে রক্ষা করে গেছেন।

১৯১৮ সালের অক্টোবরে অটোম্যানরা, বিদ্রোহী আরব আর ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণের মুখে পুরো আরব ভূমি তাদের কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে ব্রিটিশদের হাতে পরে। অন্যকোন রকম রসদ আর সাপোর্ট সরবরাহ ছাড়াই , ফকরুদ্দিন পাশা আর তার সৈন্যরা মদিনায় আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করে গেছে।

ব্রিটিশদের প্ররোচনায় আরব বিদ্রোহীরা , কোনো কোনো দিন মহানবী (সা:) এর শহর মদিনায় ১৩০টির ও বেশি বার আক্রমণ করেছিল। আরব বিদ্রোহী হোসাইন আর তার ছেলেরা এবং তাদের সমর্থকরা ৩০০টির বেশি ব্রিটিশদের দেয়া বোমা ফাটিয়েছিলো মদিনা শহরে। আরব বিদ্রোহীরা আর ব্রিটিশরা একত্র হয়ে, ডিনামাইট দিয়ে , মুসলিম উম্মার ঘাম, শ্রম , অর্থে গড়ে তোলা সুলতান আব্দুল হামিদের স্বপ্নের হিজাজ রেলওয়ে কে ধ্বংস করে দিয়েছিলো।

টি ই লরেন্স নিজেই ৭৯টি রেলসেতু উড়িয়ে দিয়েছিলো , আরব বিদ্রোহীদের সহায়তায়।

হিজাজ রেলওয়ে ধ্বংসের পর অটোমান সৈন্যদের রসদ আসা বন্ধ হয়ে যায়। আকাশ থেকে পঙ্গপাল, ফড়িং উড়ে এসে পড়ছিলো মদিনায়। খাদ্যের অভাবে অটোমান সৈন্যরা ফড়িং পঙ্গপাল খেয়ে বেঁচেছিল এবং তার পরও মদিনাকে পতন হতে দেয়নি।

ফখরুদ্দিন পাশা তার সৈন্যদের বলেছিলেন ,

“এই পঙ্গপাল তুলে নিয়ে সিদ্ধ করে খাও অথবা, না খেয়ে মারা যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আমরা বাঁচি বা মরি , সারেন্ডার কোনো অপসন না আমাদের জন্য। আমাদের বেঁচে থাকতে হবে নবী (সা: ) এর শহরকে রক্ষা করতে ” .

অটোমান সম্রাজ্যকে যখন ব্রিটিশদের হাতে সারেন্ডার করতে বাধ্য করা হয় ১৯১৮ সালে , মদিনায় ওই বীর অটোমান সৈন্যরা ফকরুদ্দিন পাশার নেতৃত্বে ক্ষুদা সৈহ্য করে মদিনাকে রক্ষা করে গেছে। তিনি মদিনা ছেড়ে যেতে অসম্মতি জানায়।

তিনি বলেছিলেন ,

“ইয়া রাসূলুল্লাহ , আপনাকে ছেড়ে দিবোনা কখনোই। “

একদিন তিনি মসজিদ-উন-নববীর মিম্বারে দাঁড়িয়ে তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলছিলেন ,

“সৈন্যরা আমার, সবাইকে আহব্বান জানাচ্ছি , আমি সবাইকে অর্ডার দিচ্ছি নবী (সাঃ) এর নিরাপত্তার জন্য , নবী (সাঃ) এর শহরের নিরাপত্তার জন্য, সর্বশেষ বুলেট দিয়ে , সর্বশেষ যে জীবিত থাকবে , শত্রুরা সংখ্যায় যাই হোক প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে। আল্লাহ সহায় হন এবং রসুলাল্লাহ (সাঃ) এর দোয়া যেন আমাদের উপর থাকে। আমার বীর তুর্কি বাহিনীর সৈন্যরা , আমার সামনে এসে সবই শপথ নাও যে নিজের ধর্ম বিশ্বাসের সম্মানে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত তোমরা। ”

শরীফ হোসাইন ৫ই জুন , ১৯১৭ সালে আরব বিদ্রোহের ঘোষণা করেন। খুব তাড়াতাড়ি মক্কা আর জেদ্দার পতন হয় , কিন্তু ফকরুদ্দিন পাশার সৈন্যরা শপথ করে মদিনাকে প্রতিরোধ করার। শরীফ হোসাইন আর তার ব্রিটিশ মিত্র টি ই লরেন্স প্রথমেই হিজাজ রেলওয়ের পথ ধ্বংস করে ইস্তানবুল থেকে সিরিয়া হয়ে মদিনার পথ বন্ধ করে দেয়।

শরীফ হোসাইন যাকে স্বয়ং খলিফা নিজেও সম্মান করতেন নবী (সাঃ ) এর বংশধর হওয়ার জন্য। এই শরীফ হোসাইন ও ক্ষমতার লোভে মুসলিম উম্মার সাথে বেইমানি করেছিল। শরীফ হোসাইন, ফখরুদ্দিন পাশাকে চিঠি লিখে তার আর ব্রিটিশ মিত্রের হাতে আত্মসমর্পণ করতে বলেন।

উত্তরে ফখরুদ্ধীন পাশা লিখেন ,

“প্রাপক যিনি মুসলিম উম্মার শক্তি আর ঐক্য নষ্টকারী , যিনি মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে রক্তপাত ঘটাচ্ছে , যিনি খেলাফত আর আমিরুল মোমিনুনকে বিপদের মুখে ফেলেছে, যিনি ব্রিটিশ আধিপত্যের মধ্যে ইসলামকে ফেলছেন, মঙ্গলবার রাতে ১৪ ই জুল হিজ্জর আমি স্বপ্নে দেখতে পাই , আমি ক্লান্ত হয়ে হাটছিলাম, মদিনা প্রতিরোধের বেপারে চিন্তিত ছিলাম। তারপর আমার সামনে খুবই সুন্দর চেহারার একজনকে সামনে দেখতে পাই, তিনি ছিলেন , রাসুল্লাহ (সাঃ ), তিনি তার বাম হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে আমাকে রক্ষণাত্মক ভাষায় বলেছিলেন , আমাকে অনুসরণ করো। আমি দুই তিন করম তাকে অনুসরণ করলাম। তার পর ঘুম থেকে উঠলাম। এখন আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ ) নিরাপত্তায় আছি , তিনিই আমার শ্রেষ্ঠ লিডার , আমি নিজেকে মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সময় পার করছি, মদিনায় রাস্তা আর চত্বর নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছি। সতরাং আমাকে অপ্রয়োজনীয় প্রলোভন দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। ” – ওমর ফখরুদ্দিন পাশা

৯ই জানুয়ারী ১৯১৯ সালে, অটোমানদের একদল ফখরুদ্দিন পাশাকে বুঝতে আসে যে পুরু আরবের পতন হয়েছে, মদীনাকে আর প্রতিরোধ করে চালিয়ে যাওয়া যাবে না। ফখরুদ্দিন পাশা রাসূলাল্লাহ (সাঃ) এর কবরের পাশে বসে ছিলেন , তাকে অবশেষে অটোমানরা বাধ্য হয়ে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। ফকরুদ্দিন পাশা তার প্রতিশুতি রেখেছে এবং কখনো সারেন্ডার করেনি।

সাদিক ইয়াহিয়া নামক একজনের রিপোর্ট অনুযায়ী , যিনি শরীফের বাহিনীর সাথে মদিনা ঢুকেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে ,

“পুরো মদিনা অক্ষত অবস্থায় আছে , এমনকি প্রতিটি গাছপালা , বাগান সব অক্ষত অবস্থায় আছে। “

তারপর আরব বিদ্রোহীরা মদিনায় প্রবেশ করে , টানা ১২ দিন মদিনা শহর লুট করে। বিদ্রোহীরা বিভিন্ন জায়গা ধ্বংস করে , অসম্মান করে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধূলিসাৎ করে দেয়। আরব বিদ্রোহীরা ৪০০ বাড়ির তালা ফেঙ্গে যা পায় তাই লুট করে।

ফকরুদ্দিন পাশা অনেক দূরদর্শী ছিলেন, তিনি আগেই মদিনা থেকে মহানবী (সাঃ এর স্মৃতি বিজড়িত সব জিনিসপত্র , নথি , দলিল সব অক্ষত অবস্থায় ইস্তাম্বুলে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। তার এই উদ্যোগের ফলে মুসলিম উম্মা এখনো মহানবী (সাঃ ) এর তৈজসপত্র , নথি , দলিল এগুলু ইস্তানবুলে তাপকাপি জাদুঘরে এখনো দেখার সুযোগ পায়।

আরব বিদ্রোহের ফলাফল: প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে অটোমানদের পরাজয়ের পর, লরেন্স আর ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতালোভী শরীফ আর আরব বিদ্রোহীদের দেয়া কোনো প্রতিশ্রুতি রাখেনি। মহানবীর সেই হাদিসের মতো , ব্রিটিশরা আর ফ্রাঞ্চ মিলে আরবভূমিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। এমনকি রাশিয়ানদেরও আমন্ত্রণ করেছিল। কিন্তু রাশিয়ায় জারের বিপক্ষে বিদ্রোহের ফলে , জারের করা চুক্তি অনুযায়ী অন্নান্য ইউরোপীয়ানদের সাথে মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগাভাগির পরিকল্পনা থেকে, সোভিয়েত বলসাভিক বিপ্লবীরা সরে আসেন।

১৯১৬ সালের গোপনে করা সাইকস- পিকোট চুক্তির মাধ্যমে আরব ভূমিকে ব্রিটিশরা আর ফ্রেঞ্চরা ভাগ করে নেয়।

৩রা মার্চ, ১৯২৪ সালে , অটোমান সম্রাজ্য অফিসিয়ালি বিলুপ্ত হয় এবং খেলাফত ও শেষ হয়ে যায়। ইউরোপীয়ানদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার মতো সম্মিলিত কোনো মুসলিম বাহিনী আর নেই।

শরীফ হোসাইন আর তার সন্তানদের পরবর্তীতে ব্রিটিশরা একই ভাবে বেইমানি করে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে সাপোর্ট দিতে থাকে। এভাবেই ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় সৌদি রেজিম আরবের ক্ষমতায় যায়।

ক্ষমতা লোভী শরীফ হোসাইনের করুন পরিণতি হয় , তাকে আরবভূমি থেকে চিরতরে বের করে দেওয়া হয় এবং সাইপ্রাসে তাকে নির্বাসন দেয়া হয়, সেখানেই তার মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ দিনগুলোতে শরীফ হোসাইন কেঁদে কেঁদে কাটিয়েছে খেলাফতের সাথে বেইমানির অনুশোচনায়।

Bibliography:

Jumma Khutba By Shykh Lokman Efendi Hz, Osmani Dergahi NY

Seven Pillars of wisdom- T E Lawrence 1926

The Arab awakening : The story of Arab national movements – Hamish Hamilton 1938

Surrender of Medina: January 1919 – Elle Kaderi 1977

A peace to end all peace: The fall of Ottoman Empire and The creation of modern Middle East- David Fromkin 2009

Fekhri (Fehrettin) Pasha and End of Ottoman Rule in Medina -Stroheimer Martin 2013

In the Anglo-Arab Labyrinth: Macmohan-Hossain Correspondence and its interpretation (1914-1939) – Elle Kedouri

The Arab Revolt and Siege of Madina – ILM Film Presentation

লেখক : Julfikar Rijon 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *